আর্জেন্টিনা কি বিশ্বকাপে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
আর্জেন্টিনা কি বিশ্বকাপে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে
আর্জেন্টিনা ফুটবল দল। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু মাঠের ফলের সঙ্গে সঙ্গে লিওনেল মেসিদের ঘিরে বাড়ছে বিতর্কও। কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষে টানা দুই নকআউট ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানে জিতেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন সেই দুই জয়ই এখন নতুন প্রশ্ন তুলছে, আর্জেন্টিনা কি এই বিশ্বকাপে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে?

মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের পর বিতর্ক সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ ভাগে তিন গোল হজম করে বিদায় নেয় মিশর। এরপর মিশর কোচ হোসাম হাসান অভিযোগ করেন, তার দল অবিচারের শিকার হয়েছে। তিনি এমন ইঙ্গিতও দেন, হয়তো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও মেসিকে টুর্নামেন্টে রাখতে চাওয়া হয়েছে। তবে এমন অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।

বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল দুটি ঘটনা। মোস্তফা জিকোর একটি গোল ভিএআর দেখে বাতিল হয়। ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গোলের আগে আক্রমণ গঠনের ধাপে মারওয়ান আতিয়া লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর পা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলের আগে মোহাম্মদ সালাহ পেনাল্টি দাবি করলেও রেফারি ও ভিএআর সেটিকে স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংস্পর্শ হিসেবে দেখেছে। কলিনা পক্ষপাতের অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, ম্যাচ কর্মকর্তাদের সততা নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে ফ্রান্স-মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনালের রেফারি নিয়োগ নিয়ে। ম্যাচটির অন-ফিল্ড অফিশিয়াল দলে রাখা হয়েছে আর্জেন্টাইন রেফারিদের। ফ্রান্স যদি টুর্নামেন্টে এগোয়, সম্ভাব্য ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে আর্জেন্টিনা। সেই প্রেক্ষাপটেই নিয়োগটি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সততার প্রশ্ন নয়, তবে দেখার দিক থেকে অস্বস্তিকর বলেই অনেকের মত।

আর্জেন্টিনাকে ঘিরে আরেক আলোচিত ঘটনা গ্রুপ পর্বে মেসির সম্ভাব্য লাল কার্ড এড়িয়ে যাওয়া। আলজেরিয়ার আইসা মান্দির পেছনের পায়ে মেসির চ্যালেঞ্জে কোনো কার্ড দেখানো হয়নি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন একই ধরনের বিতর্কিত ঘটনায় ভিএআর দেখে লাল কার্ড দেখেন। এই দুই ঘটনার তুলনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিশ্লেষণে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শুধু বড় সিদ্ধান্ত নয়, কার্ডের পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিবিসি স্পোর্টসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা প্রতি ১৯.৭ ফাউলে একটি করে হলুদ কার্ড দেখেছে। এখনও টিকে থাকা দলগুলোর মধ্যে ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে সেই হার প্রতি ৭.৭ ফাউলে একটি হলুদ কার্ড। অর্থাৎ আর্জেন্টিনা বেশি ফাউল করেও তুলনামূলক কম কার্ড দেখেছে, এমন হিসাবও আলোচনায় আছে।

আরেকটি বড় বিতর্ক পথ বা ব্র্যাকেট নিয়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র-পদ্ধতিতে ফিফা শীর্ষ চার র‍্যাঙ্কিংয়ের দলকে আলাদা পথে রেখেছিল, যাতে তারা নিজেদের গ্রুপ জিতলে সেমিফাইনালের আগে একে অন্যের মুখোমুখি না হয়। এই কাঠামোর ফলে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন ও ইংল্যান্ড আলাদা পথে এগিয়েছে। এটি ফিফার ঘোষিত ড্র-কাঠামোর অংশ, কিন্তু নকআউটে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষের মান নিয়ে নতুন আলোচনাও তৈরি করেছে।

আর্জেন্টিনা প্রথম দুই নকআউট ম্যাচে খেলেছে কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষে। সর্বশেষ ফিফা র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী, কেপ ভার্দে ছিল ৬৭তম এবং মিশর ২৯তম। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড, র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৯তম। অর্থাৎ শেষ আট পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সামনে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১৫ দলের কেউ পড়েনি। অন্যদিকে স্পেনকে হারাতে হয়েছে পর্তুগালকে, আর ফ্রান্সের সামনে মরক্কো। এই তুলনাই আর্জেন্টিনার পথ সহজ কি না, সেই প্রশ্নকে বড় করেছে।

পেনাল্টির সংখ্যাও আলোচনায় আছে। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ৫টি পেনাল্টি পেয়েছিল, যা এক আসরে কোনো দলের সর্বোচ্চ। ২০২৬ বিশ্বকাপেও এখন পর্যন্ত ৩টি পেনাল্টি পেয়ে তালিকার শীর্ষে আর্জেন্টিনা। যদিও মেসি অস্ট্রিয়া ও মিশরের বিপক্ষে দুটি পেনাল্টি মিস করেছেন।

সব মিলিয়ে ছবিটা জটিল। আর্জেন্টিনার পক্ষে কিছু সিদ্ধান্ত গেছে, তাদের ব্র্যাকেট তুলনামূলক সহজ, পেনাল্টির সংখ্যাও বেশি। কিন্তু এগুলো একসঙ্গে রাখলেও সরাসরি ষড়যন্ত্র প্রমাণ করে না। বরং বলা যায়, মেসি ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে এই বিশ্বকাপের প্রতিটি সিদ্ধান্তই বাড়তি আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।

ফুটবলে উপলব্ধি অনেক সময় বাস্তবের মতোই শক্তিশালী। তাই আর্জেন্টিনা যত এগোচ্ছে, প্রশ্নও তত বাড়ছে। কিন্তু শেষ কথা একটাই, অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। মাঠে আর্জেন্টিনাকে থামাতে হলে প্রতিপক্ষকে সিদ্ধান্তের বিতর্ক ছাড়িয়ে খেলাতেও মেসিদের হারাতে হবে।

সূত্র: BBC Sport, Reuters, FIFA