মুসলিম দেশগুলো কেন এখনও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি?

বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশ কখনোই শিরোপা জিততে পারেনি, এমননি টুর্নামেন্টটির ফাইনালও খেলতে পারেনি কোনো মুসলিম দেশ। সর্বোচ্চ সাফল্য বলতে ২০০২ বিশ্বকাপে তুরস্কের তৃতীয় হওয়া আর সবশেষ ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপে মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠা। তাইতো প্রশ্ন হচ্ছে কেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো ফুটবল বিশ্বকাপে এতোটা পিছিয়ে? শুধুই কি নিজেদের দূর্বলতা নাকি আছে অন্য কোনো কূটনৈতিক খেলা?
২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়া ও পর্তুগালের মতো ইউরোপীয় শক্তিকে বিট করে মরক্কো প্রমাণ করেছিল, মুসলিম দেশগুলো শুধু অংশ নিতে নয়, শিরোপার লড়াইও করতে পারে। অন্যদিকে সৌদি আরব, ইরান, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মিশর কিংবা কাতার- সবাই মাঝেমধ্যে চমক দেখালেও ধারাবাহিকভাবে শেষ চারে পৌঁছাতে পারেনি। কারণটা কী?
শুরুতেই সামনে আসে, কাঠামোগত সমস্যা। মুসলিম কান্ট্রিগুলোতেও যথেষ্ট ভালো মানের ফুটবলার জন্ম নেয়। কিন্তু তাদের প্রতিভা সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় না। ইউরোপে যেখানে শত শত এলিট একাডেমি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ রয়েছে, সেখানে অনেক মুসলিম দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল ফেডারেশন, কোচ পরিবর্তনের সংস্কৃতি এবং তৃণমূল অবকাঠামোর ঘাটতি ফুটবলার তৈরীর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
উদাহরণ হিসেবে যদি মরক্কোকে সামনে আনা হয়, দেখা যায়, গেল এক দশক ধরে দেশটা ফুটবলে পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ করেছে। ফলেই ওদের ফুটবল প্রশাসন যেমন ঠিক হয়েছে, কোচিং নিয়েও নেই কোনো ঝামেলা আবার ইউরোপে থাকা মরক্কোর বংশদ্ভুত ফুটবলাররা হান্টিংয়েও তারা বেশ মনোযোগ দিতে পেরেছে। ফলেই ২০২২ এর মতো ২০২৬ বিশ্বকাপেও নকআউট পর্বে ওরা এখন ডার্ক হর্স।
কিন্তু অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর অবস্থা মোটেও ভালো নয়। বিশ্বকাপের আগেও সেনেগালের কোচ ইস্যুতে তৈরী হয়েছিল বিতর্ক। যেই মিশর আর্জেন্টিনাকে কাপিয়ে দিয়েছিল তাদের কোচ হোশাম হাসানও তো নিয়োগ পেয়েছিল বিতর্কিত এক সময়ে। এছাড়া মিশরের ফুটবলে সালাহর মতো তারকা থাকলেও ভবিষ্যৎ তারকা আর নেই বললেই চলে। কারণ, ওদের দেশের ফুটবল কাঠামো পুরোটাই নির্ভর করে আল আহলি আর জামালেক নামের দুটি ক্লাবের ওপর। ওদের ঘরোয়া লিগে দুর্নীতির খবর তো প্রায়ই হয় খবরের শিরোনাম।
এতো এতো সমস্যার মধ্যেও যেসব দেশ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়, তারা কি ফিফার থেকে ইউরোপের একটা দেশের মতো সমান সুযোগ সুবিধা পায়? এই প্রশ্ন ওঠার কারণ, এবারের বিশ্বকাপে ইরানের সাথে যা ঘটেছে তাতে ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন থেকে যায়। ট্রাম্পের ফোনকলে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলারের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া ইস্যুতে ইনফান্তিনো এরই মধ্যে তদন্তের মুখে। এই ব্যাপারগুলোই প্রমান করে, ইউরোপ আর আমেরিকার ফুটবল দেশগুলোর প্রতি ফিফার আছে আলাদা সফ্ট কর্নার। মুসলিম দেশগুলো তাই ফিফার থেকেও কিছুটা বৈষম্যের শিকার।
কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকায় অভিযোগগুলো একটা সময় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাইতো মুসলিম দেশগুলোকে বিম্বকাপে ভালো করতে হলে, ঘরোয়া লিগ শক্তিশালী করতে হবে; পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আর্থিক বিনিয়োগ, কোচিং, স্পোর্টস সায়েন্স এবং ধারাবাহিক উন্নয়ন- যেখানে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো এখনও অনেক এগিয়ে। মুসলিম দেশগুলো এসব দিকে নজর দিতে পারলেই মরক্কোর পথ ধরে সেনেগাল, মিশর, সৌদি আরবের মতো দেশও বিশ্বমঞ্চে চমক দেখাতে পারে।





