Advertisement

বড় হওয়ার আগেই বিশ্বজয়, কীভাবে তৈরি হচ্ছেন ইয়ামাল-সূর্যবংশীরা

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
বড় হওয়ার আগেই বিশ্বজয়, কীভাবে তৈরি হচ্ছেন ইয়ামাল-সূর্যবংশীরা
লামিনে ইয়ামাল ও বৈভব সূর্যবংশী। ছবি: সংগৃহীত

উনিশতম জন্মদিনে লামিনে ইয়ামালের চাওয়া ছিল নিউইয়র্কে যাওয়া। কয়েক দিনের মধ্যেই সেখানে পৌঁছালেন তিনি, পর্যটক হিসেবে নয়, বিশ্বকাপ জিততে। যে বয়সে অধিকাংশ ফুটবলার মূল দলে কয়েক মিনিট খেলার অপেক্ষায় থাকেন, ইয়ামালের অর্জনের তালিকায় তখনই তিনটি লা লিগা, একটি ইউরো এবং একটি বিশ্বকাপ।

অন্যদিকে ক্রিকেটে ১৫ বছরের বৈভব সূর্যবংশী ভারতের জার্সিতে খেলছেন, আন্তর্জাতিক অর্ধশতক করছেন। মিরা আন্দ্রেভা ১৯ বছরেই ফ্রেঞ্চ ওপেন চ্যাম্পিয়ন। দৌড়, ফর্মুলা ওয়ান, সাঁতার থেকে বাস্কেটবল, প্রায় প্রতিটি খেলাতেই কৈশোর পেরোনোর আগেই হাজির হচ্ছে নতুন বিস্ময়।

এতগুলো প্রতিভা একই সময়ে উঠে আসা কি শুধুই কাকতালীয়? সম্ভবত নয়। আধুনিক খেলাধুলা এখন আর প্রতিভার বড় হওয়ার অপেক্ষা করে না। ছয় বছর বয়সে তাকে খুঁজে বের করে, দশ বছরেই পেশাদার প্রশিক্ষণ দেয়, প্রযুক্তিতে শরীরের প্রতিটি পরিবর্তন মাপে এবং কৈশোরেই সর্বোচ্চ মঞ্চের জন্য তৈরি করে।

প্রশ্ন তাই শুধু ইয়ামালরা এত দ্রুত বড় হলেন কীভাবে, তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, খেলাধুলা কীভাবে শিশুদের এত দ্রুত বিশ্বজয়ের জন্য তৈরি করতে শিখল?

বিস্ময় বেড়েছে, নাকি শুধু চোখে পড়ছে বেশি?

অল্প বয়সে আলো ছড়ানো খেলোয়াড় নতুন কোনো ঘটনা নয়। পেলে ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। নাদিয়া কোমানেচি, মার্টিনা হিঙ্গিস ও ওয়েইন গ্রেটস্কির মতো কিংবদন্তিরাও কৈশোরেই নিজেদের খেলায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তবে তাদের দেখা হতো বিচ্ছিন্ন বিস্ময় হিসেবে।

এখনকার চিত্রটি ভিন্ন। ইয়ামাল ও সূর্যবংশীর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার ১৮ বছর বয়সী দৌড়বিদ গাউট গাউটকে ২০২৮ অলিম্পিকের সম্ভাব্য তারকা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফর্মুলা ওয়ানে কিমি আন্তোনেল্লি, সাইক্লিংয়ে পল সেক্সাস, ডার্টসে লুক লিটলার, সাঁতারে সামার ম্যাকিনটোশ ও বাস্কেটবলে কুপার ফ্ল্যাগ কৈশোরেই প্রতিষ্ঠিত তারকাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

মাত্র ১৫ বছর বয়সেই অভিষেক হয় ইয়ামালের।
মাত্র ১৫ বছর বয়সেই অভিষেক হয় ইয়ামালের।

তরুণ ক্রীড়াবিদদের নিয়ে তিন দশক ধরে কাজ করা ক্রীড়াবিজ্ঞানী জো আইজেনম্যান মনে করেন, আগের তুলনায় সত্যিই বেশি কিশোর তারকা উঠে আসছেন কি না, পরিসংখ্যান ছাড়া সেটি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। অল্প বয়সে বড় অর্জনের গল্প মানুষের মনোযোগ বেশি টানে। ফলে এই খেলোয়াড়েরা অন্যদের তুলনায় দ্রুত আলোচনায় চলে আসেন।

যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তনও বড় ভূমিকা রাখছে। দুই বা তিন দশক আগে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কোনো ১৬ বছর বয়সী রেকর্ড গড়লে খবরটি সবার কাছে পৌঁছাত না। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। একজন কিশোর কী খাচ্ছেন, কীভাবে অনুশীলন করছেন কিংবা অবসরে কী করছেন, সেসবও সমর্থকদের অজানা থাকে না।

ফলে প্রতিভাবান কিশোরের সংখ্যা যতটা বেড়েছে, তার চেয়েও বেশি বেড়েছে তাদের দৃশ্যমানতা।

কঠিন খেলায় কিশোরেরা টিকছেন কীভাবে?

সর্বোচ্চ পর্যায়ের খেলাধুলা এখন আগের তুলনায় আরও দ্রুতগতির ও শারীরিকভাবে কঠিন। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, গত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকে ফুটবলারদের ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে দৌড়ানো ছিল বিরল। অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপে ৩৫ জন ফুটবলার ঘণ্টায় ৩৫ কিলোমিটারের বেশি গতি তুলেছেন।

১৯ বছর বয়সী টেনিস সেনসেশন মিরা আন্দ্রেভা।
১৯ বছর বয়সী টেনিস সেনসেশন মিরা আন্দ্রেভা।

ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব বাথের শারীরিক বিকাশবিষয়ক বিশেষজ্ঞ শন কামিংয়ের মতে, একজন সাধারণ ১৬ বছর বয়সীর পক্ষে আধুনিক পেশাদার ফুটবলে টিকে থাকা আগের তুলনায় অনেক কঠিন। এরপরও ইয়ামালদের মতো খেলোয়াড়েরা পারছেন, কারণ প্রতিভা খুঁজে বের করা ও তাকে গড়ে তোলার ব্যবস্থাও আমূল বদলে গেছে।

বড় ক্লাবগুলোর প্রতিভা অনুসন্ধানের জাল এখন এত বিস্তৃত যে সম্ভাবনাময় ছয় বছর বয়সী ফুটবলারও তাদের চোখ এড়িয়ে যায় না। স্থানীয় একটি দলে খেলার সময় ইয়ামালকে প্রথম দেখেছিল বার্সেলোনা। তার বয়স তখন মাত্র ছয় বছর।

বার্সেলোনার মূল দলে ইয়ামালের অভিষেক হয় ১৫ বছর ৯ মাস ১৬ দিন বয়সে। তাকে প্রথম দলের অনুশীলনে দেখে জাভি বুঝেছিলেন, অন্যদের চেয়ে আলাদা কিছু আছে এই কিশোরের মধ্যে। বল নিয়ে দক্ষতার পাশাপাশি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই তাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছিল।

ফমূর্লা ওয়ানের চলতি মৌসুমে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে ১৮ বছরের বালক কিমি আন্তোনেল্লি।
ফমূর্লা ওয়ানের চলতি মৌসুমে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে ১৮ বছরের বালক কিমি আন্তোনেল্লি।

পাঁচ বা ছয় বছর বয়সে কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবে অনুমান করা অবশ্য প্রায় অসম্ভব। বয়ঃসন্ধির সময় উচ্চতা, শক্তি, গতি ও শারীরিক সমন্বয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। খুব প্রতিভাবান মনে হওয়া কোনো শিশু পরে থেমে যেতে পারে। আবার শারীরিকভাবে পিছিয়ে থাকা আরেকজন কয়েক বছরের মধ্যে সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

তারপরও ক্লাবগুলো অপেক্ষা করতে চায় না। কারণ তাদের মনে পরবর্তী মেসিকে হারানোর ভয় কাজ করে। আজ যাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, কাল তাকেই তুলে নিতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো ক্লাব।

দশ বছরেই পেশাদার প্রস্তুতি

প্রতিভা চিহ্নিত করা কঠিন হলেও তাকে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া এখন অনেক বেশি পরিকল্পিত। আগে শক্তি ও শারীরিক সক্ষমতার যে অনুশীলন পেশাদার হওয়ার পর শুরু হতো, অনেকেই এখন তা পাচ্ছেন ১০ বা ১১ বছর বয়স থেকে।

দলের অনুশীলনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত দক্ষতা প্রশিক্ষক, শারীরিক সক্ষমতা বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদের সহায়তাও পাচ্ছে শিশুরা। তাদের দৌড়ের গতি, শরীরের ওপর পড়া চাপ, ঘুম, খাদ্যাভ্যাস এবং বেড়ে ওঠার বিভিন্ন ধাপ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

একজন কিশোর সকালে দলের সঙ্গে অনুশীলন করার পর বাড়তি দক্ষতা বাড়াতে আলাদা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগত প্রশিক্ষকের কাছে শারীরিক সক্ষমতা নিয়েও কাজ করছেন। শিশু বয়সেই তিনি এমন পেশাদার পরিবেশ পাচ্ছেন, যা আগের প্রজন্মের অনেক খেলোয়াড় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেও পাননি।

এই ব্যবস্থার ফলেই ইয়ামাল কিংবা সূর্যবংশীরা শুধু প্রতিভার ওপর নির্ভর করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আসছেন না। বড় মঞ্চে ওঠার আগেই তাঁদের শরীর ও মনকে সেই চাপের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

জন্মসনদের বয়সই সব নয়

একই দিনে জন্ম নেওয়া দুই শিশুর শারীরিক বিকাশ এক রকম নাও হতে পারে। একজন ১৩ বছরেই প্রায় পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতো লম্বা ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। অন্যজনের সেই পর্যায়ে যেতে আরও পাঁচ বছর লাগতে পারে।

আগে দ্রুত বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়েরা একাডেমিতে বাড়তি সুবিধা পেত। শক্তি ও গতিতে এগিয়ে থাকায় তাদের বেশি প্রতিভাবান মনে করা হতো। অন্যদিকে কারিগরি দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও শারীরিকভাবে পিছিয়ে থাকা কিশোরেরা বাদ পড়ে যেত।

এখন অনেক একাডেমি জন্মসনদের বয়সের সঙ্গে খেলোয়াড়ের জৈবিক বয়সও বিবেচনা করে। শরীরের বর্তমান উচ্চতা ও বিকাশের ধাপ বিশ্লেষণ করে অনুমান করা হয়, পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় সে কতটা লম্বা হতে পারে এবং তার শরীরের আরও কতটা বেড়ে ওঠা বাকি।

এতে প্রশিক্ষকেরা বুঝতে পারেন, কোনো খেলোয়াড় নিজের প্রতিভার কারণে এগিয়ে আছে, নাকি বয়সের তুলনায় দ্রুত শারীরিক বিকাশের সুবিধা পাচ্ছে। একইভাবে সাময়িক শারীরিক দুর্বলতার কারণে কারিগরি ও মানসিকভাবে এগিয়ে থাকা কোনো খেলোয়াড়কে হারানোর ঝুঁকিও কমে।

বয়ঃসন্ধির সময় দ্রুত উচ্চতা বাড়লে শরীরের ভারসাম্য ও নড়াচড়ার সমন্বয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ১৫ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে ইয়ামালের উচ্চতা প্রায় ১০ সেন্টিমিটার বেড়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সময় তার অনুশীলনের চাপও সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে।

সাউথহ্যাম্পটনের জার্সিতে ১৫ বছরের গ্যারেথ বেল।
সাউথহ্যাম্পটনের জার্সিতে ১৫ বছরের গ্যারেথ বেল।

গ্যারেথ বেলের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। ১৫ বছর বয়সে দ্রুত উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার পর তার পারফরম্যান্সে বড় পতন আসে। সাউদাম্পটন একাডেমি থেকে প্রায় বাদই পড়ে যাচ্ছিলেন তিনি। একাডেমির একজন কর্মকর্তা সমস্যাটি শারীরিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বুঝতে পারেন। এরপর বেলের অনুশীলনে পরিবর্তন আনা হয় এবং ছয় মাসের মধ্যে সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন ভবিষ্যতের এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।

বড় সাফল্যের বড় ঝুঁকি

অল্প বয়সে পেশাদার প্রস্তুতির ঝুঁকিও রয়েছে। একটি খেলায় অতিরিক্ত বিশেষায়িত হয়ে একই ধরনের অনুশীলন বারবার করলে দীর্ঘস্থায়ী চোটের আশঙ্কা বাড়ে। এর সঙ্গে থাকে মানসিক চাপ, প্রত্যাশার বোঝা এবং খেলাটির প্রতি আগ্রহ হারানোর ভয়।

কিশোর বয়সেই ইয়ামাল কিংবা সূর্যবংশীদের বড় চুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নজর এবং কোটি মানুষের প্রত্যাশা সামলাতে হচ্ছে। মাঠে একটি খারাপ দিনও তখন শুধু খারাপ দিন থাকে না। সেটি নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন।

তাই দ্রুত তারকা তৈরির পাশাপাশি কিশোর ক্রীড়াবিদকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং খেলাটির আনন্দ ধরে রাখা এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে হবে।

ইয়ামাল কিংবা সূর্যবংশীর মতো প্রতিভা এখনো প্রতিদিন আসে না। তবে উন্নত অনুসন্ধানব্যবস্থা তাদের আগেই খুঁজে পাচ্ছে, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ দ্রুত প্রস্তুত করছে এবং শারীরিক বিকাশ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তাদের হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করছে।

খেলাধুলা কিশোরদের বড় হওয়ার আগেই বিশ্বজয়ের জন্য তৈরি করতে শিখেছে। এখন তার সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা, বিশ্বজয়ের পথে তাদের শৈশব যেন হারিয়ে না যায়।

*দ্য অ্যাথলেটিক থেকে অনূদিত।