Advertisement

আলজাজিরার প্রতিবেদন/লোহিত সাগর সুরক্ষায় কেন জোট গঠন করল সৌদি আরব

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
লোহিত সাগর সুরক্ষায় কেন জোট গঠন করল সৌদি আরব
লোহিত সাগর সুরক্ষায় জোট গঠন করল সৌদি আরব। ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের হাত থেকে লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে রক্ষা করতে এক আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। এই জোটে যোগ দিতে বহু দেশকে আহ্বান জানায় রিয়াদ।

বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) রাতে সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি দেশ এই জোটে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের মধ্যে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরে তেল সরবরাহ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এরপর গত ২০ জুলাই ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের ওপর জলপথ অবরোধ ঘোষণা করে, যা এই রুটে তেল পরিবহনকে ভীষণভাবে ব্যাহত করে। এ ছাড়া ইয়েমেন উপকূলের কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর হুতিরা শুল্ক বা টোল বসানোর পরিকল্পনা করছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এমনিতে বিশ্ববাজারে পারস্য উপসাগরীয় জ্বালানি সরবরাহ স্থবির হয়ে পড়েছিল, তার ওপর লোহিত সাগর রুটে এই নতুন উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দর ও সরবরাহের পথে নতুন করে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করেছে।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই জোটের মূল কার্যালয় বা সদর দপ্তর হবে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে। লোহিত সাগরের বর্তমান পরিস্থিতি ও এই জোট সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো:

কারা থাকছে এই জোটে?

সৌদি আরব ছাড়াও এই সামরিক জোটে যোগ দেওয়া নিশ্চিত করা ১৩টি দেশ হলো— তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান এবং কোমোরাস।

তবে ইরানসংক্রান্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ওমান এখনও এতে সই করেনি। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইনি বা রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর যে কোনো দেশের জন্যই এই জোটের সনদে যুক্ত হওয়ার সুযোগ খোলা থাকবে।

সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত ঘোষণা না দিলেও ওয়াশিংটন এতে যুক্ত হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার জোট গঠনের উদ্বোধনী বা প্রস্তুতিমূলক বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও অংশ নেয়। উল্লেখ্য, ইইউয়ের অ্যাস্পাইডস নামের একটি নিজস্ব নৌ-সুরক্ষা মিশন ইতোমধ্যেই লোহিত সাগরে চালু রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, জোট চালুর প্রাক্কালে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন।

সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকের খবর সম্পর্কে জানা একটি সূত্র জানিয়েছে—ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ আর না বাড়ানোর পক্ষে সৌদি আরবের অবস্থানের কথা ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দিয়েছেন প্রিন্স সালমান। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, সৌদি আরব নিজেকে রক্ষা করতে শতভাগ প্রস্তুত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রিন্স সালমান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সকে জানিয়েছেন, ইয়েমেনের হুতি সংকট মোকাবিলা করার সামর্থ্য সৌদি আরবের নিজেরই রয়েছে এবং এক্ষেত্রে তাদের সরাসরি কোনো মার্কিন সাহায্যের প্রয়োজন নেই।

তবে এর পরপর গত মঙ্গলবার সৌদি ভূখণ্ডে ইরান-পরিচালিত ড্রোন হামলার জবাবে পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক ঘাঁটিতে যৌথ বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব।

এ হামলার দায় চাপানোর পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবিতে এক অজ্ঞাতনামা ইরানি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, এসব হামলার পেছনে ইরানকে দায়ী করা বড় ভুল।

লোহিত সাগর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লোহিত সাগরের একপাশে সৌদি আরব ও ইয়েমেন, আর অন্যপাশে রয়েছে মিশর, সুদান, ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও সোমালিয়া। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটি পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ এই সাগর দিয়ে পরিচালিত হয়।

লোহিত সাগরের মূল গুরুত্ব নিহিত রয়েছে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল বিদেশে রপ্তানির জন্য এই সংকীর্ণ প্রণালিটি পৃথিবীর প্রধানতম ধমনী। এ ছাড়া লোহিত সাগরে ঢোকা ও বের হওয়ার প্রধান দুটি মাত্র পথ রয়েছে— যার একটি সুয়েজ খাল, অন্যটি এই বাব আল-মান্দেব।

বাব আল-মান্দেব প্রণালিটি এর সবচেয়ে সরু পয়েন্টে মাত্র ২৯ কিলোমিটার (১৮ মাইল) চওড়া। যার কারণে জাহাজ আসা ও যাওয়ার জন্য কেবল দুটি সরু চ্যানেল ব্যবহার করা যায়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে ৪১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল এই বাব আল-মান্দেব হয়ে যাতায়াত করেছে, যা বৈশ্বিক মোট পরিমাণের প্রায় ৫ শতাংশ।

সম্প্রতি মার্কিন-ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্য থমকে যাওয়ায়, সৌদি আরব বাধ্য হয়ে তাদের রপ্তানি তেল লোহিত সাগরের ‘ইয়ানবু’ বন্দরের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সৌদি আরবের সেই রুটটিও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের হুমকির মুখে পড়েছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেতো, যা এখন বন্ধ। আর বর্তমান সংঘাতের কারণে এখন বিশ্ববাজারের প্রায় ২৫ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

কেন লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালাচ্ছে হুতিরা?

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ২০১৪ সালে দেশটির রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এরপর থেকে তারা বন্দর নগরী এডেন ভিত্তিক সৌদি সমর্থিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে।

এর ধারাবাহিকতায়, দীর্ঘদিন ধরে চালানো সৌদি সামরিক অভিযানের জবাবে গত ২০ জুলাই সৌদি আরবের ওপর নৌ-অবরোধ বা সামুদ্রিক ব্লকেড ঘোষণা করে হুতিরা। সানা বিমানবন্দরে সৌদি জোটের হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে এই ব্লকেডের ডাক দেওয়া হয়।

হুতি নেতৃত্বের অভিযোগ, সৌদি আরব গত ১২ বছর ধরে তাদের ওপর নিপীড়নমূলক অবরোধ চাপিয়ে রেখেছে। তাদের দাবি, সৌদিরা ইয়েমেনের সম্পদ লুণ্ঠন করছে এবং দেশটির সমুদ্র, স্থল ও আকাশপথে সার্বিক অবরোধ বহাল রেখেছে।

ব্লকেডের পর থেকে একাধিক সৌদি পতাকাবাহী জাহাজ ও তেলের অবকাঠামোয় হামলা চালানো হয়েছে। হুতি সামরিক মুখপাত্র এহিয়া সারিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, তাদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ‘এনসিসি গাজাল’ নামক এক সৌদি তেল ট্যাংকার পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।

এর আগে ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হলে, তার প্রতিবাদে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে ইসরায়েল-সংক্রান্ত জাহাজে আক্রমণ চালিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক শিপিংয়ে অচলাবস্থা তৈরি করেছিল হুতিরা।

হুতিরা কি লোহিত সাগরে শুল্ক বসানোর পরিকল্পনা করছে?

বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, হুতিরা লোহিত সাগর অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক বা টোল আরোপের চিন্তাভাবনা করছে। উল্লেখ্য, ইরানও একইভাবে হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব শুল্ক আদায়ের চেষ্টা করছে।

ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-ইরিয়ানি এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) ইয়েমেনের হুতিদের এই টোল আদায়ের পরিকল্পনায় সরাসরি মদদ দিচ্ছে।

তথ্যমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো থেকে টাকা বা মাশুল তুলতে একটি বিশেষ সংস্থা গঠনের ছক কষছে হুতিরা। তবে কবে থেকে এই শুল্ক আদায় শুরু হবে তা এখনও পরিষ্কার নয়।

ইরিয়ানি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথকে কোনো সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহী মিলিশিয়া দলের আয়ের স্থায়ী উৎসে পরিণত করার এই প্রচেষ্টা অত্যন্ত বিপজ্জনক এক উসকানি।

মূলত এই টোল আদায়ের ইস্যুটি মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনার টেবিলেও তীব্র উত্তাপ ছড়াচ্ছে। কারণ ইরান আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজের অবাধ বা বিনামূল্যে যাতায়াতের দিন আর ফিরে আসবে না এবং ভবিষ্যতে সেখানে নিয়ম মেনেই ফি দিতে হবে।

যদিও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, কোনো আন্তর্জাতিক প্রণালীর সীমানায় অবস্থিত দেশগুলো (যেমন হরমুজ বা বাব আল-মান্দেব) চলাচলের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে কোনো টোল বা ট্যাক্স দাবি করতে পারে না— এমনকি প্রণালিটি পুরোপুরি তাদের দেশের সীমানার ভেতরে হলেও নয়। তবে ডকিং বা নিরাপত্তার মতো কিছু নির্দিষ্ট সেবামূলক কাজে ফি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ইয়েমেন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে মনোনীত আফরা আল-জৌবা এক সংবাদ সম্মেলনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হুতিরা মূলত ইরানের পথ অনুসরণ করতে চাইছে। তারা যদি এতে সফল হয়, তবে পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে থাকা বিশ্বের দুটি প্রধান সামুদ্রিক গেটওয়ে বা দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

বিশ্ব বাণিজ্য ও তেলের বাজারে এর কী প্রভাব পড়ছে?

রয়টার্সের তথ্যমতে, হুতি আক্রমণের আতঙ্কে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত সপ্তাহান্তে এই প্রণালী দিয়ে মাত্র ১১টি জাহাজ যাতায়াত করতে পেরেছে।

অথচ ২০২৩ সালে সংঘাত শুরু হওয়ার আগে, প্রতিদিন গড়ে ৭০টিরও বেশি বিশালাকার জাহাজ বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতো। ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেলের বিশ্ববাজার বেশ অস্থিতিশীল ছিল, যা বুধবার নতুন করে আরও চড়ে বসেছে।

চলতি মাসের শুরুতে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম কমে ৭২ ডলারে নামলেও, নতুন এই সংকটে তা বেড়ে ৮৮ দশমিক ০৯ ডলারে উঠে এসেছে। গত সপ্তাহে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের চরম মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করে যায়।