মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন/সৌদি পরমাণু চুক্তিতে ‘ইসরায়েল শর্ত’ মার্কিন কূটনীতির বড় ভুল

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনকে প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে রেখেছে সৌদি আরব। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির সুবিধার্থে রিয়াদকে এই অবস্থান থেকে সরানোর চেষ্টা করা হলে, তা উল্টো মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নিজস্ব প্রভাবই দুর্বল করে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোনো জমকালো ঘোষণার ওপর নির্ভর করছে না। এটি নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের একটি বিশেষ যোগ্যতার ওপর। তাদের বুঝতে হবে কৌশলগত স্বার্থ আর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যে পার্থক্য কোথায়। যুক্তরাষ্ট্র যদি বেসামরিক পরমাণু চুক্তির জন্য সৌদিকে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার শর্ত দেয়, তবে সেটি হবে মস্ত ভুল। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন দুটি ভিন্ন কূটনৈতিক লক্ষ্যকে এক করে ফেলবে।
আপাতদৃষ্টে মনে হতে পারে এই কৌশল মার্কিন দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াবে। তবে বাস্তবে এটি মার্কিন প্রভাব কমিয়ে দেবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে বহুমুখী মেরুকরণকে আরও ত্বরান্বিত করবে। প্রশ্ন এটি নয় যে, রিয়াদ ও তেল আবিবের সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে তা আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষা করবে কি না। বরং প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন কীভাবে আশা করে যে রিয়াদ তাদের দুই দশকের পুরোনো অবস্থান থেকে সরে আসবে।
সৌদি আরব দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে অনড় অবস্থান ধরে রেখেছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করার পরই কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে। এর আগে নয়।
সৌদি আরবের এই অবস্থানকে অনেকে দর-কষাকষির কৌশল মনে করেন। তবে এটি ভুল ধারণা। এটি আসলে তাদের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত নীতি। ২০০২ সালের ‘আরব শান্তি উদ্যোগ’-এর মূল উদ্যোক্তা ছিল সৌদি আরব। সেই উদ্যোগে বলা হয়েছিল, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ও দখলকৃত এলাকা থেকে ইসরায়েলকে সরে যেতে হবে। তবেই আরবরা ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করবে। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি কর্মকর্তারা বারবার এই প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
এর থেকে বোঝা যায়, এটি তাদের সাময়িক কোনো অবস্থান নয়, বরং স্থায়ী কৌশল।
এই বাস্তবতা এড়িয়ে গেলে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অধীনে সৌদি পররাষ্ট্রনীতির বড় পরিবর্তনটি বুঝতে ব্যর্থ হতে হবে। গত এক দশকে রিয়াদ তাদের অর্থনৈতিক মডেলে বড় বদল এনেছে। তারা আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বাড়িয়েছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তারা ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করেছে। চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। নিজেদের দেশে ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে।
তবে এই বাস্তবমুখী নীতি ফিলিস্তিন ইস্যুতে রিয়াদকে নমনীয় করেনি। সৌদি নেতারা মনে করেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে থাকা তাদের আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক সুনামের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ওয়াশিংটনের চোখে বেসামরিক পরমাণু চুক্তির একটি বড় কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। এই চুক্তি হলে দুই দেশের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী হবে। একই সঙ্গে সৌদির বেসামরিক পরমাণু অবকাঠামোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় থাকবে। কিন্তু এই সহযোগিতা বন্ধ করার মাশুল অনেক বেশি হতে পারে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলেও সৌদি আরব পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করবে না।
বরং রিয়াদ বিকল্প উৎস থেকে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বিশেষজ্ঞ নেওয়ার চেষ্টা করবে। এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আসল প্রশ্নটি সৌদি আরবের পরমাণু শক্তি অর্জনের ইচ্ছা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, সেই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে কি না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই পরিবর্তনকে ওয়াশিংটনকে মেনে নিতে হবে। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, তাদের বন্ধুদের কোনো বিকল্প নেই। তবে আজ সেই দিন বদলে গেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ছে। রাশিয়ার প্রভাবও ফুরিয়ে যায়নি। বিশ্বের উদীয়মান শক্তিগুলোও এখন সক্রিয়। ফলে আমেরিকার একক আধিপত্যের দিন এখন শেষ।
এই পরিবর্তনের যুগে শর্তারোপের রাজনীতি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। শর্ত দেওয়ার কূটনীতি তখনই সফল হয়, যখন শর্তগুলো বাস্তবসম্মত হয়। কিন্তু কোনো দেশকে যদি তার জাতীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক ভাবমর্যাদার পরিপন্থী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়, তবে তা কাজ করে না।
গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আরব অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার। ফলে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকারকে উপেক্ষা করে যেকোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ এখন সাধারণ মানুষ সহজে মেনে নেবে না।
এর মানে এই নয় যে, রিয়াদ ও তেল আবিবের সম্পর্ক কখনোই স্বাভাবিক হবে না। সৌদি নেতৃত্ব বারবার বলেছেন, একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে। তবে এখানে পর্যায়ক্রমটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করার আগেই সৌদিকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চাপ দেওয়া ভুল হবে।
ওয়াশিংটনের বোঝা উচিত, বহুমুখী বিশ্বে প্রভাব বজায় রাখতে হলে সহযোগীদের স্বার্থকেও সম্মান করতে হয়। জোর খাটিয়ে সব সময় কূটনৈতিক সাফল্য পাওয়া যায় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের এই কৌশলগত অংশীদারত্ব আট দশকের বেশি পুরোনো। যুদ্ধ, তেল সংকট বা রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেও এই সম্পর্ক টিকে ছিল। কারণ, উভয় পক্ষ নিজেদের বাস্তব কৌশলগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিল।
একটি বেসামরিক পরমাণু চুক্তিকে তার নিজস্ব গুণাগুণের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত। এর সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়গুলো জড়িয়ে আছে। কিন্তু এমন একটি শর্ত রিয়াদের ওপর চাপানো হচ্ছে, যা তারা কখনোই মেনে নেবে না। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র কেবল একটি বাস্তবসম্মত সহযোগিতার সুযোগই হাতছাড়া করবে।
কূটনীতিতে সাফল্য আসে বাস্তবতাকে মেনে নিলে, তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে আঞ্চলিক শান্তি ও দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সহযোগিতা—দুটিই বজায় থাকে। একটি অর্জনের জন্য অন্যটিকে বিসর্জন দেওয়ার নীতি সফল হবে না।
লেখক: আহমেদ আলতুওয়াইজিরি একজন সৌদি শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও কবি। তিনি ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক দর্শনে পিএইচডি করেছেন। তিনি রিয়াদের কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অনুষদের সাবেক অধ্যাপক ও ডিন ছিলেন।
.png)







