Advertisement

নানা অভিযোগে ২৩ মাস কলেজে না এসেও পুনর্বহাল অধ্যক্ষ

এশিয়া পোস্ট নিউজ, রংপুর
নানা অভিযোগে ২৩ মাস কলেজে না এসেও পুনর্বহাল অধ্যক্ষ
অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান। ছবি: সংগৃহীত

গত ২৩ মাস ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও রংপুর নগরীর সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে মো. শাহজাহানের পুনর্বহাল নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিগত সরকারের পতনের পর থেকে আত্মগোপনে থাকা এই অধ্যক্ষকে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের সব পাসওয়ার্ড ও নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে জিম্মি করে রাখায় প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বেতন-ভাতা আটকে দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি বঞ্চিত করারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে দলীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, চাকরির প্রলোভনে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতিষ্ঠানের তহবিল তছরুপসহ নানাবিধ অনিয়মে জড়িত ছিলেন অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান। সরকারের পটপরিবর্তনের পর এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এসব অনিয়মের বিষয়ে জবাবদিহিতা চাওয়া হলে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট থেকে অধ্যক্ষ শাহজাহান এবং একই বছরের ২৫ আগস্ট থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক শহিদা আক্তার বানু বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দেন।

দীর্ঘ সময় অধ্যক্ষ অনুপস্থিত থাকায় একই বছরের ১৯ মো. আ.ত.ম মকছুদার রহমানকে (দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে) দায়িত্ব প্রদান করেন রংপুরের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুল মান্নান। মাকছুদার রহমান গত বছরের ১ এপ্রিল অবসরে গেলে কিছুদিন সিনিয়র শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। পরে একই বছরের ২৬ অক্টোবর সিরাজুল ইসলাম দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু সাঈদ প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র শিক্ষক মো. মোস্তফা জামানকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব প্রদান করেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ চলতি বছরের ১৮ মে এক পত্রের মাধ্যমে ১৬ মার্চ হতে মোস্তফা জামানকে অব্যাহতি দিয়ে অধ্যক্ষ মো. শাহজাহানকে স্বীয় দায়িত্বে পুনর্বহাল করেন।

অভিযোগ উঠেছে, পুনর্বহাল পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান না করেই শাহজাহান ঈদুল আজহার উৎসব ভাতা ও মে মাসের বেতন সিনিয়র শিক্ষক মোস্তফা জামানের জন্য সাবমিট করেননি। কোনো কারণ ছাড়াই বেতন বন্ধ করে দিয়ে এটিকে ‘মন্ত্রণালয়ের আদেশ’ দাবি করলেও এর সপক্ষে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি শাহজাহান। অপরদিকে প্রতিষ্ঠানের ৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে শাহজাহানের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোস্তফা জামান, যা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষকেরা অফিস কক্ষে অলস সময় কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও ছুটি ছাড়াই অনুপস্থিত রয়েছেন। নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই বাড়ি চলে গেছে অধিকাংশ শিক্ষার্থী।

স্কুলের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী গোলাম রব্বানী বলে, গত তিন-চার মাস ধরে স্কুলে ঠিকমতো ক্লাস হচ্ছে না। আমরা শুনেছি আমাদের অধ্যক্ষ আবার দায়িত্ব পেয়েছেন, কিন্তু তিনি তো গত দুই বছর ধরেই স্কুলে আসেন না। অন্য শিক্ষকেরাও নিয়মিত আসছেন না।

একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জি এম কাদের বলে, অন্যরা উপবৃত্তির টাকা পেলেও আমরা পাইনি। স্যারদের কাছে গেলে তারা জানান, অধ্যক্ষ কলেজের পাসওয়ার্ড নিজের কাছে আটকে রাখার কারণে তা সাবমিট করা সম্ভব হয়নি। আর অধ্যক্ষ তো স্কুলেই আসেন না।

দশম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী জেসমিন আক্তার জুলি বলে, অধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধান শিক্ষক গত দুই বছর ধরে প্রতিষ্ঠানে আসেন না। স্যার-ম্যাডামদের যখন ইচ্ছা আসেন আর যান, ক্লাস তেমন হয় না। তাই আমরাও দুপুর হলেই বাড়ি চলে যাই।

এ বিষয়ে সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোস্তফা জামান বলেন, গত বছরের ২৬ অক্টোবর অডিটের সময় আমাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়। চলতি বছরের ১৮ মে সিরাজুল ইসলামের মাধ্যমে পাঠানো পত্রে আমাকে অব্যাহতি দিয়ে অধ্যক্ষ শাহজাহানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান না করে অনুপস্থিত থেকেই এমপিওসহ সকল ধরনের পাসওয়ার্ড নিজের কাছে জিম্মি করে রাখেন। কোনো কারণ ছাড়াই আমার ঈদুল আজহার উৎসব ভাতা ও বেতন বন্ধ করে রেখেছেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, অনুপস্থিত অধ্যক্ষের কাছে পাসওয়ার্ড থাকায় ষষ্ঠ, নবম ও একাদশ শ্রেণির প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। গত ২৩ মাসে তিনি এক দিন শুধু লোকবল নিয়ে এসে ঘুরে গেছেন। নতুন করে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি সিনিয়র শিক্ষক সিরাজুল ইসলামের নামে চিঠি ইস্যু করে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় পরিচালনা করছেন। তিনি নিজে উপস্থিত না থাকায় প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়েছে। শিক্ষকেরা সময়মতো আসেন না, ক্লাসও বন্ধ রয়েছে। অন্যায়ভাবে বেতন বন্ধের বিষয়ে আমি উপজেলা শিক্ষা অফিস, জেলা শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো সমাধান পাইনি।

অভিযুক্ত অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান বলেন, আমি মাঝেমধ্যে প্রতিষ্ঠানে যাই। মোস্তফা জামান মুকুল মাস্টার নিজেই হাজিরা খাতা লুকিয়ে রাখেন। গতকালও আমি প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলাম।

সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তফা জামানের বেতন বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যখন আমার বিল বন্ধ ছিল, তখন মন্ত্রণালয়ের আদেশ থাকা সত্ত্বেও তারা তা পাস করেনি। তাই মন্ত্রণালয় থেকেই মোস্তফা জামানের বিল বন্ধ রাখা হয়েছে, এখানে আমার কোনো হাত নেই।’ তবে এ সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট চিঠি প্রতিবেদককে দেখাতে পারেননি তিনি।

শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি না পাওয়ার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, মুকুল মাস্টার উপবৃত্তির ফরম আটকে রাখায় সাবমিট করা সম্ভব হয়নি, এখানে আমার কোনো অপরাধ নেই। মুকুল মাস্টার ও কিছু স্থানীয় লোক মিলে প্রতিষ্ঠানটি নষ্ট করছে।

রংপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. এনায়েত হোসেন জানান, সাহেবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহজাহান ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে স্বীয় পদে বহাল করা হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন কি না সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে এবং নিয়মিত অফিস করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হবে। সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বেতন বন্ধের অভিযোগের বিষয়ে তাকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

উপবৃত্তি বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যদি উপবৃত্তি না পাওয়ার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেয়, তবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) খৃষ্টফার হিমেল রিছিল বলেন, আমি কয়েক দিন ধরে এ পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। আগের এডিসি স্যার বিষয়টি বিস্তারিত জানতেন। তবে লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয় :রংপুর