ল্যাব আছে, ব্যবহার নেই/প্রযুক্তি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত নাটোরের শিক্ষার্থীরা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, নাটোর
প্রযুক্তি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত নাটোরের শিক্ষার্থীরা
ল্যাবে পড়ে আছে কম্পিউটার। ছবি: এশিয়া পোস্ট

শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় দক্ষ করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নাটোরে সরকারি উদ্যোগে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হলেও তা কোনো কাজে আসছে না। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কম্পিউটার শেখানোর কথা থাকলেও শিক্ষকরা ল্যাবে না নিয়ে শুধু বই পড়িয়েই দায়িত্ব শেষ করছেন। এমনকি সরকারি এসব কম্পিউটার শিক্ষকদের বাড়িতে নিয়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং ল্যাবে তালাবদ্ধ করে রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যার ফলে আইসিটি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কম্পিউটার না ছুয়েই বছরের পর বছর পার করছে শিক্ষার্থীরা। ল্যাব ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেক অভিভাবক বাড়তি টাকা খরচ করে বাইরে থেকে সন্তানদের কম্পিউটার শেখাচ্ছেন।

শিক্ষকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি যেদিন কম থাকে সেদিন ১০ জন করে ল্যাবে এনে ১০ মিনিট করে শিখিয়ে তাদের ছেড়ে দিয়ে আবারও ১০ জনকে নিয়ে ক্লাস করাই। এভাবে করতে গিয়ে আধা ঘণ্টা বা ৪০ মিনিটে ক্লাস করানো সমস্যা হয়ে যায়। এ ছাড়া বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির কাজের জন্য তারা সাময়িকভাবে কম্পিউটার বাসায় নেন বলে জানান।

তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের হাতে-কলমে প্রযুক্তি শিক্ষা দিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কম্পিউটার ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হয় না। শিক্ষকরা বইয়ে থাকা আইসিটি বিষয় ক্লাসেই পড়িয়ে দেন।

অভিভাবকরা বলছেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কম্পিউটার ল্যাবে কিছু না শেখানোর ফলে তাদের সন্তানদের বাড়তি টাকা খরচ করে বাইরে থেকে কম্পিউটার শিখতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নিয়মিত মনিটরিং করে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে তারা দাবি জানান।

চন্দ্রকোলা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহিম আহমেদ, আবির হোসেন ও পারভেজ মোশাররফসহ আরও অনেকে জানায়, তাদের বিদ্যালয়ে আইসিটি ক্লাস বাধ্যতামূলক হলেও শুধু বইয়ের পড়া মুখস্থ করানো হয়; কম্পিউটার ল্যাবে নিয়ে প্র্যাকটিক্যালি কিছুই শেখানো হয় না। ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকাকালীন তাদের একদিনও ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হয়নি। সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পর মাত্র তিন দিন নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রাক্তন এক শিক্ষার্থী জানায়, স্কুলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কম্পিউটার শেখানো হয়নি। ফলে কলেজে ওঠার পর কম্পিউটার সম্পর্কে কিছু না বোঝায় বাধ্য হয়ে নিজের টাকা খরচ করে কোর্স করতে হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, যদি নিজেদের টাকা খরচ করেই কম্পিউটার শিখতে হয়, তাহলে সরকার কেন এত টাকা খরচ করে স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব দিয়েছে?

অভিভাবক আব্দুল মান্নান জানান, তার দুই ছেলে স্কুলে পড়ার সময় সেখানে কম্পিউটার থাকা সত্ত্বেও ভালো করে শেখানো হয়নি। আধুনিক যুগে কম্পিউটার না শিখলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার ভেবে পরে তিনি নিজের উদ্যোগে বাড়ি থেকে তাদের কম্পিউটার শেখান। এখন তার মেয়েও কম্পিউটার শেখার চেষ্টা করছে। ছেলেরা কম্পিউটার শিখে এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করতে পারছে।

টিআইবি’র সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি রনেন রায় বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে আইসিটি শিক্ষা সরঞ্জাম রয়েছে, তা শিক্ষকরা অনেক সময় ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে থাকেন। এমনকি কখনও কখনও তা বাড়িতেও নিয়ে যান। এতে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই সম্পদগুলো যথাযথভাবে রক্ষা করার জন্য শিক্ষকদের সঠিক মানসিকতা ও প্রপার ট্রেনিং থাকা উচিত। ইলেকট্রনিকস পণ্য ব্যবহার না করলে বা প্রতিষ্ঠানের বাইরে নিয়ে ব্যবহার করলে তা নষ্ট হতে পারে। এতে সরকারের বড় বিনিয়োগের উদ্দেশ্য সফল হয় না।

তিনি আরও বলেন, সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে ল্যাব দিয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য। অথচ কম্পিউটারগুলো নিয়মিত ব্যবহার না করায় অনেক সময় অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। এতে একদিকে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বাচ্চারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে বাইরে টাকা খরচ করে কম্পিউটার শিখছে। কারণ যে কোনো সেক্টরে গেলেই এখন কম্পিউটারের ব্যবহার জানা প্রয়োজন। এই সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি উপকরণ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা, তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা দপ্তর বা শিক্ষা অফিসারদের নিয়মিত তদারকি করা উচিত।

এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রোস্তম আলী হেলালী জানান, জেলার ৭১৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯২টিতে কম্পিউটার ল্যাব আছে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ক্লাস না নিয়ে কম্পিউটার বাড়িতে নিয়ে যান—এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয় :নাটোর