গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ আসলে মৃত: ফুয়াদ

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ রায় দিয়েছেন যে আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আসলে মৃত, কারণ তারা জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) রাতে বেসরকারি একটি টেলিভিশনের টকশোতে অংশ নিয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, দেশের মানুষ সরল বিশ্বাসে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা দিয়েছিল। কিন্তু ১৭ বছরে দলটি জনগণের প্রতিটি আকাঙ্ক্ষার জায়গা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ইজমা (ঐকমত্য) তৈরি হয়েছে যে, আওয়ামী লীগকে আর কোনো রাজনৈতিক সুযোগ দেওয়া যাবে না। দলটি রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি ডেড (মৃত)। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে মানুষ সমষ্টিগতভাবে রায় দিয়েছে যে, আওয়ামী লীগ আসলে মৃত। কারণ তারা জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশে প্রথম ফ্যাসিবাদের সূচনা হয়েছিল। তখন সব গণমাধ্যম বন্ধ করে দিয়ে মাত্র চারটি সংবাদপত্র চালু রাখা হয়েছিল। শাসকগোষ্ঠী বারবার আমাদের রাষ্ট্রীয় আকাঙ্ক্ষাকে ভুলুণ্ঠিত করেছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় এই দেশের মাটিতে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে তাদের ভূমিকা ছিল। শেখ মুজিব যুদ্ধ বা দেশের স্বাধীনতা চেয়েছিলেন কি না; সেই তর্কের বাইরেও তাকে সামনে রেখেই মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি দেশে ফিরে মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় সেনাদের ফেরত নিতে ইন্দিরা গান্ধীকে বাধ্য করেছিলেন। শেখ মুজিব ছাড়া অন্য কেউ এটি করতে পারতেন কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। তবে তার হাতেই বাকশাল কায়েম হয়, তার নেতৃত্বেই প্রথম ফ্যাসিবাদ আসে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ১৯৪৭ সালে আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র পেলেও তা আমাদের মর্যাদা দিতে পারেনি। এজন্য ১৯৭১ সালে লড়াই করতে হয়েছে। এরপর ৯০ এবং সবশেষ ২০২৪ সালে আন্দোলন হয়েছে।
তিনি বলেন, একটি ফ্যাসিবাদকে কতবার রাজনৈতিক সুযোগ দেওয়া হবে? ১৯৭৫ সালের পর এই শেখ পরিবারের ফ্যাসিবাদকে কিন্তু নিষিদ্ধ করা হয়নি। ফলে তাদের অবদান যেমন সত্য, তেমনি তাদের নেতৃত্বে দেশে দুবার ফ্যাসিবাদ কায়েম হওয়াও চরম সত্য।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত উদার। প্রথমবার ফ্যাসিবাদের পরও কেউ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলেনি। মানুষ ভেবেছিল, একটি পরিবর্তন হয়েছে। পরবর্তীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের চাবি তিনি নিজে হাসিনার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। আর এই উদারতার জন্য শেষ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানকে নিজের জীবন দিতে হয়েছে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা মারণাস্ত্র ও যুদ্ধাস্ত্র দেশের মানুষের ওপর নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহার করেছে। যেসব অস্ত্র সাধারণত পুলিশ ব্যবহার করে না এবং যা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য; যেমন এলএমজি, মেশিনগান, স্নাইপার, ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার ও ৯ মিলিমিটার অটোমেটিক রাইফেল; সেগুলো সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে। দেশের এলিট ফোর্স ও রেসপন্স টিমকে জনগণের ওপর লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে দেশের রাজনীতি ও নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছে এবং অর্থনীতি বেহাল দশায় পৌঁছেছে। এর বাইরে জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আপস করা হয়েছে।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, আমাদের ৫-৬ জন ডিজিএফআই প্রধান ভারতে পালিয়েছেন। সম্প্রতি পত্রিকায় এসেছে, তিনজন সিনিয়র জেনারেল কলকাতার ভারতীয় কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকায় ইন্ডিয়ান প্রটেকশনে বসবাস করছেন। আমাদের ডিজিএফআইতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর উইং অফিস খোলা হয়েছিল। প্রতিটি বাহিনীতে তাদের রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি ছিল।
তিনি বলেন, হেফাজতের আলেমসহ অনেকে জানিয়েছেন ডিজিএফআই-এর ইন্টারোগেশন সেলে তাদের হিন্দি ভাষায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এমনকি পিলখানা ট্র্যাজেডিতে শহীদ হওয়া এক অফিসারের স্ত্রীও বলেছেন, তাকে ভারতীয় কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। এর অর্থ হলো, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের পুরো রাষ্ট্র কাঠামো বিক্রি করে দিয়েছিল।
শেখ হাসিনার আমলে শুধু অর্থনীতি-প্রতিষ্ঠানই ধ্বংস করা হয়নি বরং দেশের সার্বভৌমত্বও বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ব্যরিস্টার ফুয়াদ।
তিনি বলেন, তারা ভারতের সঙ্গে অনেক গোপন চুক্তি করেছিল। ১৯৭৪ সালের বর্ডার প্রোটোকল অনুযায়ী বিএসএফ ও বিডিআর-এর মধ্যে চুক্তি ছিল, সীমান্তের ১৭৫ গজের ভেতর কোনো দেশ স্থাপনা করতে পারবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে তা লঙ্ঘন করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ভারতীয় হাইকমিশনারকে ডেকে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, ২০১০ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নতুন প্রটোকল হয়েছে এবং তিনি ১৫০ গজের ভেতরে স্থাপনা করার অনুমতি দিয়েছেন।




