চাঁদপুরে মেঘনা ও ধনাগোদা নদীতে ভাঙন, হুমকিতে বেড়িবাঁধ

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা ও ধনাগোদা নদীতে আবারও ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ‘মেঘনা-ধনাগোদা বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্প’-এর আওতাধীন ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল বেড়িবাঁধটি চরম হুমকির মুখে পড়েছে। ইতিমধ্যে নদীর বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নতুন নতুন এলাকায় ফাটল দেখা দেওয়ায় বাঁধসংলগ্ন নদীপাড়ের লাখো মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে জনপদ
সরেজমিনে দেখা গেছে, মেঘনা নদীর জহিরাবাদ লঞ্চঘাট থেকে সোনারপাড়া-সানকিভাঙ্গা, চরমাছুয়া-জনতার বাজার এলাকা এবং ধনাগোদা নদীর ষাটনল থেকে লালপুর, কালীপুর, নবীপুর-হাফানিয়া-খাগুরিয়া ও ঠেটালিয়া-সিপাইকান্দি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া মেঘনার পশ্চিমপাড়ের চরাঞ্চল বোরচর, চরউমেদ, চরকাশিম, চর ওয়েস্টার ও নাসিরের চরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি, বসতভিটা ও গাছপালা।
ভাঙন ঠেকাতে আমিরাবাদ, এখলাসপুর ও মোহনপুর এলাকায় মেঘনা নদীর তীর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্লক ফেলছে এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করছে। তবে প্রবল স্রোতের কারণে ভাঙনের তীব্রতা কমছে না।
রাতে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনই মূল কারণ
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলনের ফলেই নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে এবং তীরবর্তী অঞ্চল দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে মতলবের সীমানায় বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও পার্শ্ববর্তী জেলার কিছু অসাধু চক্র রাতের আঁধারে সীমানা অতিক্রম করে মতলব উত্তর অংশে প্রবেশ করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। এর সঙ্গে নদীর প্রবল স্রোত যুক্ত হয়ে ভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
কালিপুর বাজারসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. ফারুক হোসেন বলেন, নদীর আচমকা ভাঙনে বাজার, বসতবাড়ি, কালিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ফয়েজ আহম্মেদ মেমোরিয়াল হাসপাতাল হুমকির মুখে পড়েছে। এত দ্রুত ভাঙন হবে আমরা কল্পনাও করিনি।
লালপুর এলাকার মেহেদী হাসান রাফি বলেন, কালিপুর লঞ্চঘাট থেকে উত্তর দিকে প্রায় এক কিলোমিটার পর লালপুর এলাকাজুড়ে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেকের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। একই শঙ্কা প্রকাশ করে ইন্দুলিয়া গ্রামের কৃষক সোলেমান ভূঁইয়া বলেন, বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে আমাগো সব শেষ হয়ে যাবে। ফসল, ঘরবাড়ি হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে যামু।
ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
১৯৮৬-৮৭ সালে নির্মিত এই বেড়িবাঁধটি এর আগে দুইবার ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। নতুন করে ভাঙনের মুখে পড়েছে কয়েক হাজার একর ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, হাসপাতাল, মসজিদ ও মাদ্রাসাসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। ইতিমধ্যে বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।
ষাটনল ইউপি চেয়ারম্যান ফেরদাউস আলম সরকার বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। মতলব উত্তরবাসীকে রক্ষা করতে সরকারের জরুরি ও স্থায়ী হস্তক্ষেপ কামনা করছি। তবে সিপাইকান্দি এলাকার ইউপি সদস্য একেএম গোলাম নবী খোকন জানান, ধনাগোদা নদীর দেড় কিলোমিটার অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জিও ব্যাগ ও ব্লক ডাম্পিংয়ের কারণে কিছু এলাকায় ভাঙন কিছুটা রোধ হয়েছে।
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। মেঘনা ও ধনাগোদা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও ব্লক ডাম্পিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী সেলিম সাহেদ জানান, নদীভাঙন রোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি এলাকায় জিও ব্যাগ ডাম্পিং ও ব্লক স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।







