Advertisement

কওমি মাদ্রাসার ঘটনা নিয়ে মাওলানা আহমাদুল্লাহর ৬ প্রস্তাব

এশিয়া পোস্ট নিউজ
কওমি মাদ্রাসার ঘটনা নিয়ে মাওলানা আহমাদুল্লাহর ৬ প্রস্তাব
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাওলানা আহমাদুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সময়ে কওমি মাদ্রাসা নেতিবাচকভাবে সংবাদের শিরোনাম হওয়া এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ও ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদে আলেম-ওলামা ও দায়িত্বশীলদের প্রতি ৬টি প্রস্তাব পেশ করেছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাওলানা আহমাদুল্লাহ। কওমি মাদ্রাসার প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে তিনি এই প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করেন।

চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মনন গঠনে কওমি মাদ্রাসার ভূমিকা অনস্বীকার্য। যুগ যুগ ধরে এই শিক্ষাব্যবস্থা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের চেতনা ছড়িয়ে সৎ ও আদর্শ নাগরিক তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় কোনো অনুদান ছাড়াই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত দানে পরিচালিত ‘লিল্লাহ বোর্ডিং’ ও এতিমখানার মাধ্যমে লাখ লাখ এতিম, দুস্থ ও অসহায় শিশুর অন্ন, বস্ত্র, আবাসন ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ ভার বহনের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান সামাজিক নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করছে। ফলে রাষ্ট্র যেমন বড় আর্থিক বোঝা থেকে মুক্ত হচ্ছে, তেমনি দ্বীনি পরিবেশ ও নৈতিক শিক্ষায় আগ্রহী মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর আস্থার স্থানে পরিণত হয়েছে মাদ্রাসা।

তবে গৌরবের পাশাপাশি নির্মম সত্য স্বীকার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের প্রতি শারীরিক প্রহার, অমানবিক আচরণ ও ঘৃণ্য যৌন নিপীড়নের খবর আসছে। ইসলামী শরীয়ায় শিশুদের সঙ্গে কোমল আচরণের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে এবং অননুমোদিত যৌনাচার ও সমকামিতাকে ইসলামে কবীরা গুনাহ ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলা হয়েছে। কতিপয় তথাকথিত শিক্ষক কর্তৃক এসব কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়া একইসঙ্গে উদ্বেগজনক ও লজ্জাজনক।

তিনি বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষিতরাও মানুষ এবং ফেরেশতাদের মতো ভুলের ঊর্ধ্বে নন, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রাপ্য।

সংকটের অপর পিঠে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও অপপ্রচারের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি লেখেন, মূলধারার এক শ্রেণির গণমাধ্যম ও স্বার্থান্বেষী মহল মাদ্রাসার নেতিবাচক ঘটনাকে প্রধান লক্ষ্য বানায়। আলেমদের দ্বারা অপরাধের হার অনেক কম হলেও ইসলামী লেবাসধারী কারও খবর পেলে সত্য-মিথ্যার রঙ মাখিয়ে তা বড় করে প্রচার করা হয় এবং ব্যক্তিবিশেষের অপরাধ গোষ্ঠীর ঘাড়ে চাপানো হয়। অপরদিকে ইতিবাচক খবর প্রচারে আগ্রহ দেখা যায় না।

তিনি বলেন, এমনকি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক শত্রুতার জেরে নিরীহ আলেমদের ফাঁসানোর ঘটনাও ঘটছে; যেমন সম্প্রতি ফেনীর এক মক্তব শিক্ষকের ক্ষেত্রে ঘটেছিল, যেখানে পরবর্তীতে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে ওই আলেম সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং প্রকৃত অপরাধী চিহ্নিত হয়। আবার অনেক পুরোনো মীমাংসিত ঘটনাও একযোগে প্রচার করার পেছনে মহলের দুরভিসন্ধি থাকতে পারে।

তবে সব সংবাদ মিথ্যা নয় উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, মিডিয়ার অতিরঞ্জন বা ষড়যন্ত্রের অজুহাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে অস্বীকার করা বা অপরাধীকে ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ নেই। কঠোর আত্মসংশোধনের পথে না হাঁটলে জনমনে অনাস্থা তৈরি হবে, যা দ্বীনি শিক্ষার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ অবস্থা নিরসনে তিনি ৬টি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন:

১. কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি গঠন

আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শীর্ষ আলেম, আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠামাত্র কমিটি দ্রুত সরেজমিনে নিরপেক্ষ তদন্ত করবে।

অপরাধের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সোপর্দ করার সুপারিশ করবে এবং একটি কেন্দ্রীয় ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ (কালো তালিকা) তৈরি করবে, যাতে অভিযুক্ত ব্যক্তি আর কখনো কোনো মাদ্রাসায় চাকরি না পায়। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংবাদ সম্মেলন করে জাতির সামনে সত্য তুলে ধরা হবে, যাতে নিরপরাধ ব্যক্তি মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে পারেন।

২. অভিযোগ গ্রহণ সেল গঠন

হাইআতুল উলয়া কর্তৃক একটি সেল গঠন করতে হবে, যেখানে ভুক্তভোগীরা হটলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবে। সে ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর পরিচয় ও তথ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। এই সেল ভিক্টিমের পরিবারকে সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রদান করবে এবং তদন্ত কমিটির কাছে প্রতিবেদন ও ব্যবস্থার সুপারিশ পেশ করবে।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সংস্কার

সিসি ক্যামেরা ও মনিটরিং: ক্লাসরুম, বারান্দা এবং বিশেষ করে নূরানী, হিফয ও আবাসিক বিভাগগুলোকে সম্পূর্ণ সিসি টিভির আওতায় এনে সার্বক্ষণিক মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত আবাসন নিরুৎসাহিত করা: কম বয়সি শিশুদের অনাবাসিক হিসেবে শিক্ষাদানের চেষ্টা করতে হবে। অতি অল্প বয়সে মা-বাবার স্নেহবঞ্চিত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক আবাসনে থাকলে শিশুরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ে। তবে এতিম ও পথশিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠান বিকল্প বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে পারে।

আবাসন পদ্ধতিতে পরিবর্তন: গণরুমের ক্ষেত্রে দুই বিছানার মধ্যে ন্যূনতম এক হাত ফাঁকা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে পৃথক খাট বা স্বল্প খরচে চৌকির ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের সেবা না নেওয়া: শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনোরূপ শারীরিক সেবা নিতে পারবেন না—এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও লঙ্ঘন করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. শিক্ষক ও স্টাফদের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন

আচরণ সম্পর্কিত নীতিমালা: শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য শিক্ষার্থীদের সাঙ্গে আচরণ সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ‘আচার-আচরণ নীতিমালা’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে; বিশেষ করে শিশু মনস্তত্ত্ব, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সাথে স্নেহপূর্ণ আচরণ এবং শিশু সুরক্ষা আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

বৈবাহিক অবস্থা ও পরিপক্বতা: শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত ও নৈতিক যোগ্যতার পাশাপাশি বিবাহিত হওয়া এবং পরিপক্ব বয়সের শর্তারোপ করতে হবে। নূরানী, হিফয ও প্রাথমিক স্তরে অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণদের দায়িত্ব না দিয়ে অভিজ্ঞ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

পারিবারিক সান্নিধ্য ও ছুটি: শিক্ষকদের জন্য মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনায় সপরিবারে থাকার (ফ্যামিলি কোয়ার্টার) দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং নিয়মিত যৌক্তিক ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক জীবন স্বাভাবিক থাকে।

৫. নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতি

নারী চালিত প্রশাসনিক কাঠামো: বালিকা বা মহিলা মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামো সম্পূর্ণ নারী কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হতে হবে এবং পুরুষ শিক্ষক বা স্টাফ নিয়োগ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে (কেবল প্রধান ফটকে প্রহরী ও বাইরের কাজের জন্য বয়স্ক পুরুষ রাখা যেতে পারে)। অভিভাবক বা বহিরাগতদের সাথে যাবতীয় যোগাযোগ নারী স্টাফদের মাধ্যমেই হতে হবে।

অনাবাসিক ব্যবস্থাপনা: বালিকা মাদ্রাসা যথাসম্ভব অনাবাসিক রাখার চেষ্টা করতে হবে। আবাসিক হলে কঠোর নীতিমালা মানতে হবে এবং কোনোক্রমেই পুরুষ শিক্ষক বা স্টাফ (প্রহরী ছাড়া) রাখা যাবে না।

৬. অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে আনা

বর্তমানে দেশের আনাচে-কানাচে অপরিকল্পিতভাবে কিছু মানহীন প্রাইভেট মাদরাসা গড়ে উঠছে, যা সামগ্রিকভাবে মাদরাসা শিক্ষার মান ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। তবে এই সংকট জেনারেল শিক্ষা ব্যবস্থাতেও আছে। যত্রতত্র মানহীন কিন্ডার গার্টেন টাইপ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে। তাই সব ধরণের নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং উপযুক্ত তদারকির ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে। এর মাধ্যমে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আরও সুসংগঠিত, কার্যকর ও মানসম্মত হবে বলে আশা করা যায়।

উল্লিখিত সবগুলো প্রস্তাব হাইয়াতুল উলইয়া এবং বেফাকুল মাদারিসসহ জাতীয় বোর্ডগুলোর সরাসরি বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তবে এই দুটি অভিভাবক প্রতিষ্ঠান যদি ব্যপকভাবে সচতেনতা সৃষ্টি এবং সাধারণ নির্দেশনা জারি করে; পাশাপাশি নিবন্ধনের জন্য এই শর্তগুলো আরোপ করে এবং কঠোরভাবে মনিটরিং করে, তাহলে সমস্যাগুলো অনেকাংশে কমে আসবে বলে আমরা মনে করি।

নীতি, নৈতিকতা ও মানবিক আদর্শের অন্যতম নিরাপদ ঠিকানা এ দেশের মাদরাসাগুলো। এই পবিত্র অঙ্গন থেকে মানুষের ভরসা হারিয়ে গেলে এদেশের মুসলিমদের আত্মিক আশ্রয়ের শেষ জায়গাটুকুও বিলীন হয়ে যাবে। অতএব, আত্মপক্ষ সমর্থনের ঊর্ধ্বে উঠে, কঠোর আত্মসংশোধনের মাধ্যমে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তবেই কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য ও গৌরব অক্ষুণ্ন থাকবে।

আশা করি, কওমি মাদরাসা তথা দ্বীনি শিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে মাদরাসা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট এবং দায়িত্বশীল আলেমগণ এই প্রস্তাবনা ও আরজগুলো দ্রুততম সময়ে সদয় বিবেচনায় নেবেন এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সময়ের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ যথাসময়ে গ্রহণের তাওফীক দান করুন। আমীন।