Advertisement

আন্ডারওয়ার্ল্ডে জিসানকে ঠেকাতে সুব্রত বাইনের মেয়েকে ঘিরে ছক

আন্ডারওয়ার্ল্ডে জিসানকে ঠেকাতে সুব্রত বাইনের মেয়েকে ঘিরে ছক
শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিন বিথি (বামে) ও মতিঝিল এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী তানিম রেজা বাপ্পি (ডানে)। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ।

ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে হারানো আধিপত্য পুনরুদ্ধার এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের উত্থান ঠেকাতে সাজানো হয়েছিল এক সুদূরপ্রসারী ও লোমহর্ষক পরিকল্পনা। আর সেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিন বিথিকে কেন্দ্র করে। তাকে আদালতে আনা-নেওয়ার পথে প্রিজন ভ্যান কিংবা পুলিশের স্কোয়াড থেকে ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল। এর মাধ্যমে আন্ডারওয়ার্ল্ডে সুব্রত বাইনের উত্তরসূরি হিসেবে বিথিকে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি জিসানের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তানিম রেজা বাপ্পিকে আলোচনায় আনার পরিকল্পনা করেছিল কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।

গোয়েন্দা তথ্য ও এশিয়া পোস্টের নিজস্ব অনুসন্ধানে উঠে এসেছে- কারাগারে থাকা একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর পরিকল্পনা, নেপাল থেকে সমন্বয়ের অভিযোগ, প্রিজন ভ্যানে হামলার ছক এবং ঢাকার অপরাধ জগতে হারানো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নীলনকশা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকায় ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে সুব্রত বাইনের একক আধিপত্য অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। গত বছরের মে মাসে কুষ্টিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ আটক হন। গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি হওয়ায় তার গড়ে তোলা নেটওয়ার্ক, গোপন আস্তানা ও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এছাড়াও সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ কারাবন্দি হওয়ার পর ঢাকার অপরাধ জগতে একক আধিপত্য বিস্তার করে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। তার উত্থানের ফলে মোল্লা মাসুদ ও তার ঘনিষ্ঠ সহচরদের প্রভাব দ্রুত কমতে থাকে।

গত কয়েক মাসে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদের পরিচয়ে চলা বিভিন্ন কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নতুন করে আধিপত্য বিস্তার করা একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। এসব গ্রুপের বেশিভাগই জিসানের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে। এই আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করতে প্রিজন ভ্যানে হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে আন্ডারওয়ার্ল্ডের হারানো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে বাপ্পিকে সামনে আনে মোল্লা মাসুদ-ইখতিয়ার গ্রুপ।

শীর্ষ সন্ত্রাসী তানিম রেজা বাপ্পি। ছবি: সংগৃহীত
শীর্ষ সন্ত্রাসী তানিম রেজা বাপ্পি। ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্য বাস্তবায়নে কারাগারে নিজেদের মধ্যে তারা একাধিক বৈঠক করেন। তাদের সঙ্গে নিজের অধিপত্য ফিরে পেতে নিরবে এই পরিকল্পনার সমর্থন দেন সুব্রত বাইন। আর বাইরে থেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করেছিল পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী লেদার লিটন।

বাপ্পির পরিচয়

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া শ্যুটার তানিম রেজা বাপ্পি মতিঝিল এলাকার আলোচিত ব্যক্তি ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ইখতিয়ারের ভাগিনা। ইখতিয়ারকে দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদের ঘনিষ্ঠ সহচর ও বন্ধু হিসেবে বিভিন্ন মহলে পরিচিত বলে দাবি করা হয়। মালিবাগের আলোচিত ডাবল মার্ডার মামলার ঘটনার পর ইখতিয়ার ও মোল্লা মাসুদ একসঙ্গে ভারতে পালিয়ে যান। সেখান থেকে তাদের ঘনিষ্ঠতা আরও বৃদ্ধি পায়।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে সুব্রত বাইনের সঙ্গে বাপ্পির সুসম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইখতিয়ারের আপন ভাগিনা এবং মোল্লা মাসুদের ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় তাকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে বাপ্পির ওপরই আস্থা রাখেন এক সময়ের ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব

মোল্লা মাসুদ, জিসান ও মন্টি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে মোল্লা মাসুদ এবং জিসান-মন্টি গ্রুপের মধ্যে প্রায় দুই বছর ধরে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ক্ষমতা পালাবদলের পর থেকে তারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে দ্বন্দে জড়িয়ে যায়। এর জেরে মতিঝিল থেকে রামপুরা পর্যন্ত এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাপ্পিকে ব্যবহার করে একটি নতুন প্রভাববলয় তৈরির চেষ্টা চলছিল বলে জানা গেছে।

নাটকা বাবু। ছবি: সংগৃহীত
নাটকা বাবু। ছবি: সংগৃহীত

আন্ডারওয়ার্ল্ডের আলোচনা রয়েছে, কারাগারে থাকা অবস্থায় মোল্লা মাসুদ ও সুব্রত বাইনের মধ্যে নিজেদের আধিপত্য ফিরিয়ে পেতে এক ধরনের সমঝোতা বা সমন্বয়ের চেষ্টা হয়েছে। সে সমঝোতায় কারাগারে থাকা অবস্থায় ঢাকার শহরের চাঁদাবাজিসহ অপরাধ জগতের বিভিন্ন বিষয় দেখা শোনার দায়িত্ব পালন করবে বাপ্পি। আগামীতে বাপ্পির আধিপত্য বিস্তার করার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পিনাও করা হয়।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে লেদার লিটন এবং কারাগারে আটক মোল্লা মাসুদের হয়ে দক্ষিণ শাহজাহানপুর পশুর হাটে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন বাপ্পি। চাঁদা না পেয়ে গত ১৯ মে হাটের ইজারাদার মো. ইসমাইল হোসেনের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়। এছাড়াও মতিঝিল ক্লাবপাড়ার দুটি ক্লাবে চাঁদার দাবিতে গোলাগুলির ঘটনায় এক পথচারী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। কিন্তু আধিপত্য বিস্তার করতে চাওয়া বাপ্পির নামে এসব ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়।

একাধিক গুলিবর্ষণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে চলে আসেন বাপ্পি। প্রতিপক্ষের হামলা ও গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি সহযোগীদের নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। ঠিক এই সময়ই সামনে আসে নতুন পরিকল্পনা— সুব্রত বাইনের মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিন বিথিকে কারাগার থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা।

প্রিজন ভ্যানে হামলার ছক

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, কাশিমপুর কারাগারে থাকা সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়। এসব বৈঠকে সহায়তা করেন কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে থাকা ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও পুরান ঢাকার লালবাগের সাত হত্যা মামলার অন্যতম আসামি নাটকা বাবু। কারাগার থেকে তার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাপ্পি ও বিপুকে সুব্রত বাইনের মেয়েকে ছিনিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পুরো পরিকল্পনার সমন্বয় করেছিলেন নেপালে অবস্থানরত লেদার লিটন।

শীর্ষ সন্ত্রাসী লেদার লিটন। ছবি: সংগৃহীত
শীর্ষ সন্ত্রাসী লেদার লিটন। ছবি: সংগৃহীত

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিথিকে কাশিমপুর অথবা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকার আদালতে শুনানির জন্য আনা-নেওয়ার সময় যানজট, ফাঁকা রাস্তায় ব্যরিকেড কিংবা ট্রাফিক সিগন্যালের সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালানোর কথা ছিল।

গোয়েন্দাদের মতে, পরিকল্পনাটি সফল হলে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হতো। একই সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিয়ে সুব্রত বাইনের অপরাধ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার এবং জিসানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাপ্পিকে প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতো। এ লক্ষ্যে বাপ্পি নেপাল থেকে ঢাকায় এসে নিজস্ব একটি গ্রুপ গঠন এবং অস্ত্র সংগ্রহের কাজ শুরু করেন।

মতিঝিল থানা সূত্রে জানা গেছে, চাঁদাবাজি ও গুলির ঘটনায় মামলার পর বাপ্পি নেপালের কাঠমান্ডুতে লেদার লিটনের বাসায় চলে যান। পরে কারাগার থেকে মোল্লা মাসুদের পরিকল্পনা বাস্তাবায়নের জন্য তিনি ঢাকায় এসে জনবল ও অস্ত্র সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। এ খবর চলে যায় প্রতিপক্ষ জিসান গ্রুপের কাছে। তারা নিজেদের লোকবলের মাধ্যমে বাপ্পির ওপর নজরদারি শুরু করে। পরে পুলিশকে তথ্য দিয়ে তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়।

আদালতের রিমান্ড, পুলিশ যা বলছে

এ দিকে ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবির মামলায় গ্রেপ্তার বাপ্পি ও তার সহযোগী রাকিবুল ইসলাম ভূঁইয়ার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শনিবার (১৮ জুলাই) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এর আগে শুক্রবার সকালে হোটেল পূর্বাণী এলাকা থেকে বাপ্পি এবং দুপুরে উত্তর কমলাপুর থেকে রাকিবুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক উপ কমিশনার নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ক্ষমতার পালাবদলে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণেও বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। তবে সুব্রত বাইনের মেয়েকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য তারা যে সহজ পরিকল্পনা করছিল তা এত সহজে বাস্তবায়নের সুযোগ পেত না।

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এ ধরনের আসামিদের আদালতে আনা ও নেওয়ার সময় কারগার থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তাছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে একাধিক ঘটনার পর থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখে। আদালত এলাকায়ও পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।

এদিকে, বাপ্পিকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে চাঁদাবাজীসহ অপরাধ জগতের আগামী পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছেন, বাপ্পিকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুলিবর্ষণের ঘটনায় ব্যবহৃত অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার, তার পলাতক সহযোগীদের গ্রেপ্তার এবং আরও কী কী অপরাধমূলক পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে তথ্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা করা হবে।