টিকা নেওয়ার পরও কেন হামে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
টিকা নেওয়ার পরও কেন হামে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা
ছবি : সংগৃহীত

বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির দেড় মাস পেরিয়েছে। তবু দেশের উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকাগুলোতে হামের প্রকোপ কমছে না। আক্রান্ত হচ্ছে টিকা নেওয়া শিশুরাও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত তিনটি কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। কারণগুলো হলো—টিকাদানে পরিকল্পনার ঘাটতি, শিশুর বয়স অনুযায়ী টিকার কার্যকারিতার তারতম্য এবং মায়ের পুষ্টির অভাব।

সরকারি হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৭১ হাজার একজন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৫১২ জনের। এখনও দৈনিক গড়ে প্রায় দেড় হাজার রোগী সরকারি হাসপাতালে যাচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালের হিসাব যোগ হলে এই সংখ্যা আরও বেশি হবে।

সংক্রমণ ঠেকাতে গত ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় জরুরি ভিত্তিতে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান শুরু হয়। ঢাকাসহ চার সিটি করপোরেশনে কার্যক্রম শুরু হয় ১২ এপ্রিল। ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে একযোগে ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। সরকার বলছে, লক্ষ্যমাত্রার বেশি টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, টিকাদানের তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে হামের সংক্রমণ শূন্যে বা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার কথা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মতে, টিকার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগে। কিন্তু দেড় মাস পরও বহু জায়গায় পরিস্থিতি বদলায়নি।

বয়সের সঙ্গে সম্পর্ক

টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারীর মতে, টিকার কার্যকারিতা নির্ভর করে শিশুর বয়স, পুষ্টি এবং মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর। তার ভাষায়, ‘শিশুর বয়স যত কম, টিকার কার্যকারিতা তত কম।’

এবারের বিশেষ কর্মসূচিতে ছয় মাস বয়স থেকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, ‘আমরা ৬ মাস থেকে টিকা দিলাম তাতে কার্যকর হবে সর্বোচ্চ ৫০ ভাগ। ৯ মাস বয়সে দিলে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ আর ১৫ মাসে ৯০ শতাংশ কার্যকর হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, কানাডাসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলো ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সে প্রথম ডোজ আর দ্বিতীয় ডোজ দেয় স্কুলে যাওয়ার আগে ৪ থেকে ৬ বছরের শিশুকে। কারণ, এই বয়সে দিলে টিকা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ৯৭ ভাগ। অর্থাৎ, টিকার সঙ্গে বয়সের একটা বিরাট সম্পর্ক রয়েছে।’

মায়ের অ্যান্টিবডির ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, ‘মায়ের কাছ থেকে দুটি অ্যান্টিবডি আসে। একটি গর্ভে, আরেকটি জন্মের পর মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে। এ কারণেই ৯ মাসের আগে সাধারণত হামের ভ্যাকসিন দেওয়া হয় না। মায়ের অ্যান্টিবডি আর পুষ্টির ঘাটতি হলে ভ্যাকসিন দিলেও খুব একটা কাজ হয় না। ফলে আক্রান্ত হলে দ্রুত নিউমোনিয়া হচ্ছে, শকে চলে যাচ্ছে।’

মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি

উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ ৩০ উপজেলার একটি যশোর সদর। টিকাদানের দেড় মাস পরও সেখানে গড়ে দৈনিক ১২টি শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের অধিকাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম।

যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. আফসার আলী বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে, টিকা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। আবার টিকা প্রয়োগের সময় নির্ধারিত মাত্রা নিশ্চিত না হওয়ার কারণেও হতে পারে।’

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, ‘হাম অনেকটা মহামারি আকার ধারণ করেছে। ফলে টিকার গুণগত মান ঠিক না থাকার কারণে টিকা নেওয়ার পর হাম হতে পারে। এ বিষয়ে গবেষণা চলছে।’

ময়মনসিংহে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সেখানে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগেই হামে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম বলেন, ‘টিকা নেওয়া, না নেওয়া দুই ধরনের শিশুই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। হাম ছোঁয়াচে হওয়ায় পরিবারের অসতর্কতার কারণে এক শিশু থেকে অন্য শিশুও আক্রান্ত হচ্ছে।’

পরিকল্পনার ঘাটতি

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘টিকা দেওয়ার দেড় মাস পরও সংক্রমণের হার অনেকটা আগের মতো দেখা যাচ্ছে। এর মানে হলো, টিকা নিখুঁতভাবে দেওয়া হয়নি। বিগত সময়ে এ ধরনের বিশেষ কর্মসূচিতে যেভাবে মাইক্রোপ্ল্যান করে গোছালোভাবে প্রকৃত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতো, এবার সেটি হয়নি। ফলে টিকা দিলেও অনেকে এখনও বাকি রয়ে গেছে। শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা গেলে পরিস্থিতি বদলাবে।’

এবারের প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এবারের প্রাদুর্ভাব অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। প্রায় সব অঞ্চলে বিস্তার ঘটেছে। ফলে নির্দিষ্ট কোনো ক্লাস্টারে সীমাবদ্ধ না থাকায় নিয়ন্ত্রণে আসতে সময় লাগছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত এলাকার চারপাশে বিশেষ কর্ডন করে গুরুত্ব দিয়ে টিকা কার্যক্রম পরিচালিত না হওয়ায় সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না।’

অব্যবস্থাপনা

হামে মৃত্যু ঠেকাতে ব্যর্থতার পেছনে অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী। তিনি বলেন, ‘আক্রান্তরা হাসপাতালে যাচ্ছে, কিন্তু চিকিৎসা ঠিকমত হচ্ছে না। অবস্থাপনার কারণে প্রাণহানি ঠেকানো যাচ্ছে না। হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন, ভ্যান্টিলেটর, আইসিইউর তীব্র সংকটে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।’