Advertisement

সীমান্তে কঠোর নজরদারির পরও হাটজুড়ে ভারতীয় গরু

সীমান্তে কঠোর নজরদারির পরও হাটজুড়ে ভারতীয় গরু
রাজশাহীর সিটি হাটে ভারতীয় গরু। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঈদুল আজহা সামনে রেখে জমে উঠেছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিটি হাট। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এই পশুর হাটে এখন ক্রেতা-বিক্রেতা ও খামারিদের সরব উপস্থিতি দেখা গেলেও আশানুরূপ বেচাকেনা না হওয়ায় হতাশ অনেক ব্যবসায়ী। এরই মধ্যে হাটজুড়ে ভারতীয় গরুর উপস্থিতির অভিযোগ স্থানীয় খামারিদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে গরু, ছাগল ও মহিষ নিয়ে হাটে এসেছেন খামারিরা। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও পাইকাররা ট্রাকে ট্রাকে পশু কিনতে আসছেন। তবে দেশীয় পশুর সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার পরও বাজারে ভারতীয় গরুর সংখ্যা বাড়ছে বলে দাবি করেছেন একাধিক খামারি ও ব্যবসায়ী।

সিটি হাটে গরু নিয়ে আসা খামারি সাদিক হোসেন বলেন, ভারতীয় গরুর কারণে দেশি গরুর বাজারে প্রভাব পড়ছে। তার ভাষ্য, হাটে দিন দিন ভারতীয় গরুর সংখ্যা বাড়ছে। এতে দেশীয় গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। আমরা লোকসানের শঙ্কায় আছি।

খামারিদের অভিযোগ, গত এক মাস ধরে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা দিয়ে ভারতীয় গরু দেশে ঢুকছে। এসব গরু বৈধ-অবৈধ নানা পথে বিভিন্ন পশুর হাটে ছড়িয়ে পড়ছে। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাজারে এসব গরুর উপস্থিতি বাড়ছে বলে তাদের দাবি।

পবা থেকে আসা খামারি জলিল হোসেন বলেন, হাটে পশুর সরবরাহ অনেক বেশি হলেও বিক্রি আশানুরূপ হচ্ছে না। ১০টি গরু নিয়ে এসেছি, মাত্র দুটি বিক্রি করতে পেরেছি। ভারতীয় গরুর কারণে দেশি গরুর প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের খামারি সামিউল অভিযোগ করেন, সীমান্তের কয়েকটি পয়েন্ট ব্যবহার করে রাতের আঁধারে ভারতীয় গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তার দাবি, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় বাংলাদেশের কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে গরু পালন করা হয় এবং সেগুলো বিভিন্ন উপায়ে দেশে ঢুকছে।

রাজশাহীর সিটি হাটে ভারতীয় গরু। ছবি: এশিয়া পোস্ট
রাজশাহীর সিটি হাটে ভারতীয় গরু। ছবি: এশিয়া পোস্ট

গতকাল রোববার (২৪ মে) হাট ঘুরে দেখা গেছে, দেশীয় গরুর পাশাপাশি হরিয়ানা জাতের সাদা গরুও বিক্রির জন্য আনা হয়েছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, হাটের প্রায় ১০ শতাংশ পশুই ভারতীয় হতে পারে।

নাচোল থেকে ১৫টি গরু নিয়ে আসা খামারি নুর বলেন, গোখাদ্যের দাম বাড়ায় গরুর উৎপাদন খরচও বেড়েছে। কিন্তু একই আকারের ভারতীয় গরু বাজারে বেশি থাকায় দেশি গরুর বিক্রি কম হচ্ছে। তবে ছোট আকারের গরুর চাহিদা তুলনামূলক বেশি বলেও জানান তিনি।

ঢাকার গাবতলী থেকে আসা ব্যবসায়ী জবির হোসেন বলেন, হিসাব করলে গরুর মাংসের কেজি প্রায় ৯০০ টাকার মতো পড়ে যাচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি বুঝে এবার কিছুটা সতর্কভাবে পশু কিনছি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতীয় গরু প্রবশের ক্ষেত্রে শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের মনাকষা বিওপি এলাকা, ওহেদপুর, মনোহরপুর এবং মাসুদপুর সীমান্ত এলাকাকে চোরাচালানের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, চোরাকারবারিরা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে একটি ‘সেফ রুট’ তৈরি করেছে।

সন্ধ্যা নামলে সীমান্তের ওপারে নির্দিষ্ট পয়েন্টে গরু জড়ো করে চোরকারবারিরা। রাত গভীর হলে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে চোরাকারবারিরা গরুগুলো বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে নিয়ে আসে। যেখানে কাঁটাতারের বেড়া নেই কিংবা নদীর চর রয়েছে, সেসব স্থানই বেশি ব্যবহার করা হয়। পরে সেই গরুগুলো চলে যায় রাজশাহীসহ বিভিন্ন হাটে। এ ছাড়া রাজশাহী চর আষাড়িদাহ, খিদিরপুর ও মাঝের চর দিয়ে ভারতীয় গরু অনুপ্রবেশের অভিযোগ রয়েছে।

এই চরগুলো ব্যবহার করার কারণ হলো পদ্মার বিস্তীর্ণ নদীপথ, জেগে ওঠা বালুচর এবং কিছু অংশে তুলনামূলকভাবে কম নজরদারি। এসব জায়গা দিয়ে রাতে ছোট নৌকা বা হাঁটিয়ে গরু পার করানোর অভিযোগ পাওয়া যায়।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান বলেন, স্থানীয় খামারিদের সুরক্ষায় প্রশাসন কাজ করছে। সীমান্ত দিয়ে যাতে অবৈধভাবে গরু প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। হাটে ভারতীয় গরু প্রবেশের সুযোগ নেই। তবে কারও চোখে দু-একটি গরু ভারতীয় বলে মনে হলে সেগুলো অন্য কোনো উপায়ে আসতে পারে।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার মো. গাজিউর রহমান বলেন, ভারতীয় গরুর বিষয়ে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে ভারতীয় গরু প্রবেশের অভিযোগ অস্বীকার করেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। রাজশাহী-১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার বলেন, সীমান্তে কঠোর নজরদারি রয়েছে এবং ভারতীয় গরু প্রবেশের সুযোগ নেই।

রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর কোরবানির জন্য জেলায় প্রস্তুত করা হয়েছে মোট ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১১টি গবাদিপশু। এর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪১টি গরু, ৩ হাজার ৪২৫টি মহিষ, ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৩৯টি ছাগল এবং ৪৩ হাজার ৪০৬টি ভেড়া। জেলার মোট চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৮টি পশু। সে হিসাবে প্রায় ৯২ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে, যা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হতে পারে।